লেখক অভিনেতা – অম্লান মজুমদার

প্রশ্ন – পলাশ দাস

1 – দাদা শুরুর দিনগুলো কেমন ছিল  কবে ঠিক করলে তুমি অভিনয়টাই করবে..মানে  এটা কে একদম পেশাগতভাবে নেবে  সেটা তুমি কবে ডিসাইড করলে?

– আসলে আমার শুরুটা যদি বলতে  হয় তাহলে বলতে হবে আমার বড় হওয়া,  জন্মানো, ছোটবেলা, সেটা সুন্দরবনের গোসাবা বলে একটা গ্রামে |আমি ওখানকার ছেলে তখন আমাদের চারপাশে খুব বেশি থিয়েটার করা বা দেখার সুযোগ ছিলনা পারফর্ম করার খুব একটা  সুযোগ ছিল না কিন্তু কিন্তু ওই টিভি-রেডিও, মানে যা হচ্ছে আরকি চারপাশে সেগুলো দেখতে দেখতে এই বিষয়টার প্রতি একটা ভালোবাসা একটা ভালোলাগা তৈরি হয়| এখন পরিবার চাইবে  একটা সাধারণ মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক এরকম কোন একটা পেশা যেখানে তার নিরাপত্তা থাকবে এটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ থাকবে আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়| তার তারপর আরেকটু বড় হয়ে কোন একটা সময় আমি রিয়েলাইজ করলাম যে ডাক্তার হলে তো ইঞ্জিনিয়ার হতে পারব না আবার ইঞ্জিনিয়ার হলে ডাক্তার হতে পারব না কিন্তু অভিনয় এমন একটা পেশা একমাত্র পেশা যেখানে আমি কখনো ডাক্তার কখনো ইঞ্জিনিয়ার কখনো অধ্যাপক হতে পারি.. এমনকি চাইলে একটা বাউল ফকির বা মাতাল বা প্রেমিক হতে পারি!  ভারী মজা! আস্তে আস্তে তারপরে নিজে অভিনয় করবো,  অভিনেতা হব এই ইচ্ছে টা একেবারে বদ্ধমূল হয়ে গেল মনের মধ্যে|

তারপর পড়াশোনা শেষ করার পরে আর পাঁচজনের মতো আমাকেও চাকরি করতে হয়েছিল কিন্তু কোথাও যেন একটা মনে হচ্ছিল পেশার জায়গা থেকে আমি ঠিক স্যাটিস্ফাইড নই মানে চাকরিটা আমি শুধু আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য স্যালারির জন্য করছি কোন ভালোলাগা ভালোবাসা খুঁজে পাচ্ছিলাম না| সেটা আমার মনে হচ্ছিল ঠিক না, একটা কোথাও যেন ফাঁকিবাজি হয়ে যাচ্ছে এভাবে বেশিদিন চালানো সম্ভব নয় যদি মন আর শরীর একসঙ্গে কাজ না করে সেই কাজটা না করাই আমার মনে হয়েছে ভালো | সেটা একমাত্র আমি অভিনয়ের ক্ষেত্রে করতে পারি| একটা টাইমের পরে আমি অভিনয় টাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিই এবং মনে করি যে এটাই করবে এবার থেকে বেঁচে থাকার জন্য| তাই শুরু| বলতে হলে বলবে এভাবেই শুরু|

2- এখনতো অনেক ফিল্ম ইনস্টিটিউট গড়ে উঠেছে তোমাদের শুরুটা নিশ্চয়ই অত সোজা ছিলো না? নিজেকে গড়ে তোলার যে শুরু  সেটা কিভাবে হয়েছিল? মানে নিজেকে ঘষামাজা, তৈরি করা, মূলত থিয়েটার না অবজার্ভ করে নাকি একদম একদম শুরু থেকে অভিনয়ের একদম ছোট ছোট চরিত্র করে উঠে আসা সেটা যদি একটু তোমার দর্শকদের বল?

2 – সত্যিই আমাদের সময় সেইভাবে এত ফিল্ম ইনস্টিটিউট ছিলনা এখন অনেক ফিল্ম ইনস্টিটিউট হয়েছে সব গুলো যে কাজের তা নয় আবার এসআরএফটি আইটিআই এর মতন ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আছে| আমি যখন যেটাতে কাজ করেছি নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছি সেটা কে একটা ইনস্টিটিউট বলেই ভেবেছি সেটা থিয়েটার হতে পারে | আর ব্যক্তিগতভাবে এই ফিল্ম ইনস্টিটিউট ব্যাপারটা আমার খুব একটা বিশ্বাস বা আস্থা নেই এর কারন ও আছে |আসলে আমি এরকম বেশ কয়েকটি ফিল্ম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছিলাম যেখানে আমি অভিনয় শেখাতাম কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখলাম তাদের কাছে মূলত অর্থ উপার্জন টাই প্রধান উদ্দেশ্য |অভিনয় শেখানো প্রধান উদ্দেশ্য নয| কোথাও একটা সততার অভাব আছে| তারপর আমি নিজেকে সরিয়ে নিই, এইভাবে কাজ করাটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়| আসলে শুরুটা কিভাবে করব কিভাবে শিখতে শুরু করব সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না কেমন একটা অন্ধকারের মধ্যে হাতরে বেড়াচ্ছি লাম | তারপর সোনারপুরের একটা দলে সুযোগ পেলাম, মানে থিয়েটারে অভিনয় করার | শুরু হলো পথনাটক সেখান থেকে অন্য একটা দল তারপর অন্য একটা দল| এইভাবে চলতে চলতে একটা সময় পরিচয় হল স্যার আমার এইভাবে চলতে চলতে একটা সময় পরিচয় হলো স্যার রমা  প্রসাদ বণিকের সঙ্গে| তারপর যতটা অভিনয় আমি শিখেছি, নিজেকে আস্তে আস্তে গড়ে  তুলেছি সেটা রমাপ্রসাদ বণিক না থাকলে সম্ভব হতো না |

আর ছোট ছোট চরিত্র করে উঠে আসা বলতে মূলত টেলিভিশন এবং বড় পর্দা বা চলচ্চিত্র, সেই সময় তো এত সিনেমা এত সিরিয়াল এত গণমাধ্যম ছিল না অনেক লড়াই করে একটা কাজ পেতে হতো একটা চরিত্র পেতে হতো এবং তার জন্য বহুদিন পরিচালকের দরজায় দরজায় ষ্টুডিও ষ্টুডিও ঘুরতে  হতো, পাঠ চাইতে হত | আসলে আমি মনে করি কাজ চাওয়ার কাছে কোন লজ্জা থাকতে পারেনা কারন  আমি যে কাজটা পারি সেটা তো আমাকে প্রমাণ করতে হবে তার জন্য দরকার সুযোগ| আর আমি মনে করি যদি সত্যি মন থেকে কোন কিছুকে ভালো বেসে থাকি সেও আমাকে ভালো বাসবে, সে ভগবান হোক বা অভিনয় | ওই লড়াই, ছুটে চলা,ঘষা মাজা, অবজার্ভ করা সব মিলিয়ে অভিনয় কে উন্নততর করে তোলার একটা প্রচেষ্টা টা চলতেই থাকে |

3 -ইন্ডাস্ট্রিতে কাউকে নিজের গুরু বা  রোল মডেল বা আইডিয়াল  বলে মনে করো?

সেই ভাবে কাউকে রোল মডেল বা আইডিয়াল ভাবিনা | যখনি কাউকে কোনো চরিত্রে অসাধারন দক্ষতার সাথে অভিনয় করতে দেখি তাকেই আমার আইডিয়াল বা রোল মডেল ভাবি আর ভাবি ওহঃ কি ভালো অভিনয় করছেন আমি কেনো পারছিনা |

4- এখন অনেক সহজেই নেম ফেম  মানি পাওয়া যায়… তোমাদের শুরুর দিনগুলোতে এত ওয়েব সিরিজ এত সিনেমা এত টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না বোধ হয়.. কেমন ছিল সেই দিনগুলো? কোন আক্ষেপ হয়?

– হ্যাঁ সত্যি আমাদের সময় এত ওয়েব এতো  টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না এটা বাস্তব, আজকাল অনেক সহজেই নেম ফেম  মানি  পাওয়া যায় এটাও সত্যি| আর আমার যেটা মনে হয় খুব সহজে যেটা পাওয়া যায় সেটা ভীষণ আপেক্ষিক তার থেকে যেটা অনেক কষ্ট করে অর্জন করা যায় তার মধ্যে দিয়ে ঘষে মেজে নিজেকে তৈরি করে নেওয়াটা অনেক বেটার| না আমার কোন আক্ষেপ নেই কারণ আমি জানি যতটা আমি এগিয়ে যাই ওই একটা একটা করে সিঁড়ির ধাপ ভাঙতে ভাঙতে গিয়েছি এবং পুড়ে  না আমার কোনো আক্ষেপ নেই কারণ আমি জানি যতটা আমি এগিয়ে যাই ওই একটা একটা করে শিরির  ধাপ ভাঙতে ভাঙতে গিয়েছি এবং পড়ে  যাওয়ার ভয়টা আমার যাওয়ার ভয়টা আমার কম| অন্তত অন্তত এই ইন্ডাস্ট্রিতে এই অভিনয়টা কে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারব সেই আত্মবিশ্বাস টুকু আছে| এমনকি যদি একটু পিছিয়ে ও যাই আবার লড়াই করে কয়েকটা ধাপ উঠে আসতে পারবো বলে মনে হয়|

5- অভিনেতা হিসেবে প্রথম ভালো বা বড়ো ব্রেক  তোমার ক্যারিয়ারে তোমার কোনটা মনে হয় মানে  কোন কাজ টার পরে তোমার মনে হয় যে লোকে তোমাকে অভিনেতা  হিসেবে সিরিয়াসলি নিতে শুরু করলো.. রেকগনাইজ করল..

– এই প্রশ্নের উত্তরটা সঠিক ভাবে আমারও জানা নেই কারণ কখনো আমি ভেবে দেখিনি বা বিচার করতে বসিনি,যে কোন কাজএর পরে লোকে আমায় চিনলো বা রেকগনাইজ করতে শুরু করলো| আসলে যখন যে কাজটা পেয়েছি তখন সেটাতে নিজের 100% দেওয়ার চেষ্টা করেছি,  সেটা কেই  সেই মুহূর্তে সব থেকে বড় এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করেছি |

6- থিয়েটার না ফিল্ম ইনস্টিটিউট কোনটা বেশি  এফেক্টিভ বলে তোমার মনে হয অভিনয় শেখার জন্য

 – যদিও এই প্রশ্নের উত্তর একটু আগে হয়তো দিয়েছি তাও বলছি সো কল্ড ফিল্ম ইনস্টিটিউটগুলোতে যদি সততার অভাব থাকে শুধু অর্থ উপার্জন টাই এবং মুখ দেখানো টাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় তাহলে অভিনয় শেখাটা বা নিজেকে অভিনেতা হিসেবে তৈরি করাটা সম্ভব নয় | আর থিয়েটার,  হ্যাঁ থিয়েটার  এ সুযোগটা আছে সততা টা আছে| আমিতো থিয়েটার কে কয়েকটা ধাপ এগিয়ে রাখব|

7- এমন কোন চরিত্র আছে যেটা তোমার মনে হয় তুমি করলে খুব ভালো হতো?  তুমি আরো ভালো করতে পারতে? লোভ  হয় কোন চরিত্রের প্রতি? বা আফসোস?

 হ্যাঁ, একজন অভিনেতা হিসেবে যখনই কোনো ভালো চরিত্র দেখি তখন ইচ্ছে হয় সেটা যদি আমি করতে পারতাম, কিভাবে করতাম এই ধরনের কল্পনা এই ধরনের চিন্তাভাবনা তো আসতেই থাকে| আফসোস ঠিক এইভাবে হয় না| একটা চরিত্র যদি বলতে হয় যেটা করতে লোভ হয় অভিনেতা হিসেবে তাহলে অবশ্যই বলবে একটা বিকলাঙ্গ মানুষের চরিত্র যে হয়তো হাঁটতে চলতে পারে না, কথা বলতে পারে না,  যার নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম শুধু তার চোখ দুটো,  তাহলে কিভাবে অভিনয়টা করবে এটা করার ইচ্ছে আছে আমার জানিনা কবে সুযোগ পাবো|

8- অভিনেতা হিসেবে মানে একদম অভিনয়ের জায়গা থেকে কারোর অভিনয় দেখে তোমার মনে হিংসে হয়?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই হয় |যখনই দেখি কোন অভিনেতা তার অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে জাস্টিস করছেন না, চরিত্রটাকে তিনি হত্যা করছেন,  তখনই আফসোস হয় মনে হতো ইশ আমি যদি এটা করতাম আমি হয়তো অনেক বেটার করতে পারতাম | তবে পেশাগত দিক থেকে,  অভিনেতা হিসেবে,  ব্যক্তিগতভাবে নয়| ব্যক্তিগতভাবে হয়তো তিনি আমার বন্ধু,  আমার ভাই আমার পরিচিত আমার স্নেহের|

9- চিত্রনাট্য লেখা বেশি ইনজয় করো না অভিনয় দুটোই তো সফলভাবে করছো আগামীদিনে পরিচালনায় আসার ইচ্ছা আছে?

– দুটোই সমান ভাবে এনজয় করি কারন  আমি মনে করি এনজয় না করলে সেই কাজটা পুরোপুরি করাই যায় না,  মন থেকে করাই যায় না, যখন অভিনয় করি মন থেকে করি যখন চিত্রনাট্য লিখি  মন থেকে লিখি, ভালোবেসে| যেমন বেড়াতে যেতে ভালো না বাসলে বেড়াতে যাওয়া যায়না বেড়ানোর মজাটাই পাওয়া যায় না,  আবার যদি মনে হয় যে মদ খাব মদ টা খুব প্যাশনেটলি বা ভালোবেসে গুছিয়ে খাই ঠিক তেমনভাবেই যখন যে কাজটা করি সেটা পুরোপুরি মন থেকে এনজয়  করি,  না হলে করব না! না আপাতত পরিচালনায় আসবো কিনা আমি সত্যি নিজেও জানি না তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই আগামী দিনে অভিনয়টিনা আপাতত পরিচালনায় আসবো কিনা আমি সত্যি নিজেও জানি না তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই আগামী দিনে অভিনয় তেই  বেশি করে কনসেনট্রেট করতে চাই |

10- আগামী দিনে তোমার কি কি কাজ আমরা দেখতে চলেছি?

আপাতত আকাশ আটের প্রযোজনায় আগুনপাখি নামে একটি ধারাবাহিক আসতে চলেছে| এছাড়া বেশ কয়েকটি ছবির কাজ নিয়ে কথা হচ্ছে |আসলে  চরিত্র পছন্দ না হলে আর করতে ইচ্ছে হয় না কারন অর্থ উপার্জন টাই আমার প্রধান উদ্দেশ্য নয় | আর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ধারাবাহিকে চিত্রনাট্য লেখার কাজ চলছে| কয়েকটি ছবির চিত্রনাট্য আমি লিখছি, কাজ এগোচ্ছে| আরেকটি ছবি হয়ত খুব শিগগিরই আপনারা দেখতে পাবেন তাতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করতে চলেছি|

Rapid

1 মোহনবাগান না ইস্ট বেঙ্গল

   ইস্ট বেঙ্গল

2- অভিনয় না লেখা লেখি

   অভিনয়

3- সত্যজিৎ না ঋত্বিক

ঋত্বিক

5- ইলিশ না চিঙড়ি

ইলিশ

6- সৃজিত মুখার্জি না কৌশিক গাঙ্গুলি

সৃজিত মুখার্জি

7 – সুচিত্রা সেন না সাবিত্রী চ্যাটার্জী

সাবিত্রী চ্যাটার্জী

8 – উত্তম কুমার না সৌমিত্র চ্যাটার্জী

উত্তম কুমার

9- ছোট পর্দা না বড় পর্দা

 বড় পর্দা

10- পাহাড় না সমুদ্র

  সমুদ্র

ধন্যবাদ |

অম্লান মজুমদার – রোজ নামচা কে আমার অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here