লেখক : পলাশ দাস

সামনে বিশ্ব কাপ | একমাত্র এই সময় টা অভিরূপ তার শরীরে ও মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা অনুভব করে| যদিও তার তেমন বহিঃপ্রকাশ ঘটে না তার ব্যবহারে কারন  সব কিছুতেই তার উত্তেজনা, উচ্ছাস, আবেগ বেশ কম |  আঠেরো বছরের জীবনে খুব বেশি বিশ্ব কাপ দেখার সুযোগ তার হয় নি, হওয়ার কথাও না | আগের বিশ্ব কাপে তার বয়স ছিলো চোদ্দো | বলা যেতে পারে সেই শুরু | তার আগের বিশ্ব কাপ গুলোর স্মৃতি  অনেক হাতড়ে ও নাগাল পায়না অভিরূপ | ঝাপসা ঝাপসা কতো গুলো খন্ড চিত্র ভেসে ওঠে চোখের সামনে যেমন পাড়ার মোড়ে পত পত করে উঠছে ব্রাজিলের হলুদ সবুজ পতাকা,গোল গোল চিৎকার শুনে মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার| ফাইনাল এর দিন পাড়ার ক্লাবে পর্দা টাঙিয়ে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা | দুর থেকে যত টা সম্ভব  ওই মহোৎসব এর সম্ভব রস আহরণ করা যায় তা করতো অভিরূপ | দু এক টা ম্যাচ ও দেখেছিলো সে যদিও কার কার তা ঠিক মনে নেই | তখন পড়াশোনা কিছু দিনের জন্য শিকেয় তুলে ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠার পূর্ন স্বাধীনতা পায় নি চোদ্দো বছরের কিশোর অভিরূপ | তখনো নিজেকে কোন দলের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেবে, কার জন্য গলা ফাটাবে কার কার পতাকা টাঙ্গাবে ছাদের কারনিস বেয়ে উঠে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি অভিরূপ |

যদিও এতো উৎফুল্লতা উত্তেজনার  এতো দৈহিক বহিঃপ্রকাশ তার চরিত্রের সাথে বেমানান | সাত চড়ে রা করে না অভিরূপ, একা থাকাই তার বেশি প্রিয় কারন ছোটো থেকেই অভিরূপ শান্ত, ধীর স্থির আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে শারীরিক দুর্বলতা| কি এক টা রোগ হয়েছিল তার ছোট বেলায় তাই একটু ছোটা ছুটি করলে হাপিয়ে পড়ে অভিরূপ | দাদার হাতে মার, বাবার কাছে বকুনি তার কাছে প্রতিদিন এর ঘটনা এমনকি আজ কাল ছোটো ভাই টাও কথায় কথায় তাকে চোখ রাঙায় | পাড়ার ছেলেরা তার নাম রেখেছে কচ্ছপ | কারন তার ধীর গতি এবং মাথা নিচু করে চুপ চাপ চলাফেরা করার অভ্যাস | আজ কাল তারও মনে হয় ভারি মিল আছে তার কচ্ছপ এর সাথে | বিশেষ করে গত বছর শীতের ছুটিতে চিড়িয়া খানা থেকে কচ্ছপ দেখে আসার পর থেকে তার ওই ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়েছে

বছরের এই কটা দিন অবশ্য ওসব ভাবেনা, টোন টিটকিরি কে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না অভি | এই কদিন তার মন প্রান জুড়ে শুধু ফুটবল | পাড়ার ছেলেরাও কটা দিন ব্রাজিল আর্জেন্টিনা নিয়ে মেতে ওঠে এবং তাকে কিছু টা রেহাই দেয় | এই সময় টা তাই মন মেজাজ ভারি ভালো থাকে অভিরূপের| বাড়ির বড়োরাও সন্ধ্যের পর তাদের বকাবকি ভুলে, পড়াশোনার খবর নেওয়া ভুলে,  মুড়ি চানাচুর আর চা নিয়ে টিভির সামনে বসে পড়ে | এই বিশ্ব কাপে আনন্দ টা আরো বেশি কারন সবে তাদের পরীক্ষা শেষ হয়েছে | আপাতত পড়ার তেমন কোন চাপ নেই |

ব্রাজিল জিতে ছিলো ! তবু কোন জাদুতে যে সেই জয় উত্তর কলকাতার এই সরু গলিতে অবস্থিত যুবক সংঘের জয় হয়ে গেলো তা অভিরূপ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি |মনে আছে ফাইনালের দিন রাতে পিকনিক হয়েছিল তাদের পাড়ায় |সারারাত হুল্লোড় | তখনো বেশি রাতে বাড়ির বাইরে থাকার  ছাড়পত্র পায়নি অভি|একবার মাঝরাতে দোতালার ঝুল বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলো সে | বিশ্বকাপের উত্তাপ  কিছুটা কিছুটা অনুভব করেছিলো অভি দুর থেকে|

এবছর অভিরূপের জায়গা হয়েছে ক্লাবের দর্শক আসনের শেষ সারিতে | যদিও রাতের খেলা গুলো সে বাড়িতেই দেখে | সন্ধ্যে টা কাটে ক্লাবে|হাফ টাইমের বিরতি তে যখন সবাই ব্যাস্ত হয়ে পড়ে ম্যাচের চুল চেরা বিশ্লেষনে আর অতীত বিশ্বকাপ গুলোর স্মৃতি চারনায়, অভিরূপ ডুব দেয় তার কল্পনার রাজ্যে | সবুজ গালিচা পাতা মাঠে বল নিয়ে  দৌড়াচ্ছে অভি | গ্যালারি তে তিল ধারণের স্থান নেই, সবার মুখে একটাই নাম অভি !অভি ! অভি ! অবশেষে আসে সেই মহেন্দ্রক্ষণ তার সু নিপুন শটে বল জড়িয়ে যায় গোলে | সহ যোদ্ধা রা ছুটে এসে কাঁধে তুলে নেয় তাকে | পিঠ চাপড়ে দেয় কেউ কেউ | দর্শকের বাধ ভাঙা উচ্ছাস | সব মিলিয়ে সে যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি | এটা ইদানিং স্বপ্নেও দেখেছে অভি বেশ কয়েক বার |

ফরাসি দলটির প্রতি অভিরূপের একটু দুর্বলতা তৈরী হয়েছে এখন | বিশেষ করে ওই ফর্সা টাক মাথা লোকটার প্রতি | অধিনায়ক হলে এমন হও | কি লড়াই টাই না লড়ছে প্রতিটা ম্যাচে| কি স্কিল, কি ঠান্ডা মাথা আর অভিজ্ঞতা তো আছেই | অভিরূপ শুনেছে 1998 সালে ওই লোকটাই নাকি ফরাসি দের চ্যাম্পিয়ন করেছিলো সেবার | একা লড়াই করে | মনে পড়ে না অভিরূপের | এখন সে ওই ওই দশ নম্বর জার্সির ভক্ত তার সাথে জিদান নামের ওই খেলোয়াড় এর | এখন সে ফরাসি দলের সমর্থক | মনে প্রাণে চায় প্রতিটা ম্যাচে জিতুক তার দল | আর গোল করুক তার প্রিয় খেলোয়াড় টা |

অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় অভিরূপ ওই ফরাসি খেলোয়ার এর সাথে তার নিজের ব্যক্তিত্বর | দুজনেই ধীর, স্থির, শান্ত,নম্র ও ভদ্র | কোথায় যেন বেশ মিল আছে হাঁটা চলা ব্যবহারের মধ্যেও | করুর প্রোরচনায় পা দেয় না তার নায়ক,শুধু ভালো খেলাই তার লক্ষ্য তার ধ্যান জ্ঞান | ঠিক যেমন পাড়ার বকাটে ছেলে গুলো শত চেষ্টা করেও রাগাতে পারেনা অভিরূপ কে | সে থাকে তার কল্পনার জগৎ এ | তবু আজ কাল বেশ রাগ হয় অভিরূপের যখন কেউ তার স্বপ্নের ফুটবলার কে খারাপ বলে, ফরাসি দল টির নিন্দে করে | মাঝে কিল ঘুসি ও চালিয়ে দেয় অভি তবে ওই কল্পনায় | এই তো সেদিন ভোম্বল হাসতে হাসতে ক্লাবের সামনের বেঞ্চে বসে বললো ” ওই বুড়ো আর কতো খেলবে, বিশ্ব কাপ জেতানোর দম আর ওর নেই ” সেদিন ল্যাম্প পোস্টে ভোম্বলের মাথা ঠুকে দিয়েছিলো অভি কান ধরে ওঠ বোস ও করিয়েছিলো বেশ কয়েকবার, বাস্তবে নয় | কল্পনার জগতে | এমন ঘটনা আজকাল প্রায় ই ঘটে অভিরূপের জীবনে |

ইদানিং ছবি কিনতে শুরু করেছে অভিরূপ | সবই তার গুরুর ছবি | হাত খরচের প্রায় সবটাই খরচ হছও ছবি কিনতে | কিনছে আর একটা খাতায় আঠা দিয়ে সাঁটছে | তার ঘরের দেয়ালেও লাগিয়েছে কয়েকটা | মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আবছা নিয়ন আলোয় ওই ছবি গুলোর দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকে সে | হারিয়ে যায় এক সুন্দর কল্পনার রাজ্যে | শুনতে পায় দর্শকের হাত তালি, চিৎকার,আরো কত কি |

গ্ৰুপ পর্যায়, কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমি ফাইনাল পেরিয়ে বিশ্বকাপ এখন ক্রমশঃ ফাইনালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর | উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছে | তবে নীল সাদা আর সবুজ হলুদ ক্যাম্প হতাশায় ডুবে গেছে কিছুটা | তাদের দল ছিটকে গেছে এই মহারন থেকে | কোথাও যত্ন করে নামিয়ে নেয়া হয়েছে তাদের পতাকা কোথাও এখনো অবহেলায় ঝুলে আছে |কাপ এবার ইউরোপ এ যাবে এটা নিশ্চিত | তাতে কি তবু তো বিশ্বকাপ |কেউ কেউ রাতারাতি দল বদল করেছে কেউ আবার ” জিতবে তো ফুটবল ” এই গোছের মন্তব্য করে আবার টিভির সামনে বসে পড়েছে |অভি বেশ খুশি, তার দল ফাইনালে তার হিরো এখন অনেকের হিরো | সে এখন স্বঘোষিত ফরাসী সমর্থক | তার দল গোল করলে এখন নির্ভয়ে হাত তালি দিয়ে ওঠে অভি |

ইদানিং কুঁজো হয়ে হাঁটেনা অভি, মেরুদন্ড সোজা করে রাস্তায় হাটে | মাথা তার বরাবর ঠান্ডা তবে এখন চারপাশ থেকে যে ব্যঙ্গক্তি গুলো উড়ে আসে সেগুলো কে মনে মনে শট মেরে, ডচ করে এগিয়ে যায় অভি, হাসে মনে মনে|সে দিন দিন কিভাবে যেন তার হিরোর মত হয়ে যাচ্ছে| ব্যাপার ভেবে নিজেই অবাক হয় অভি |

ফাইনালে এক অপ্রত্যাসিত ঘটনা ঘটে গেলো | কোনো একটা কথায় মাঠেই মেজাজ হারালো অভির নায়ক | খ্যাপা সাড়ের মত গুঁতিয়ে দিলো তার প্রতিপক্ষ কে | লুটিয়ে পড়লো সেই খেলোয়াড় | লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হলো বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় কে | মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়লো লোক টা | হয়তো এই শেষ বার বিশ্বকাপের ফাইনাল থেকে বিদায় নিলো একবারের বিশ্ব কাপ যেতা পৃথিবীর সর্ব কালের সেরা ফুটবলার দের একজন | মিস্টার কুল |জিনেদিন জিদান | কিছুক্ষন নিজের চোখ কেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না অভির | চোখের কোন টা শুধু চিক চিক করে উঠেছিলো | আর ফাইনাল দেখেনি অভি | নিজের ঘরে গিয়ে বালিশে মাথা গুঁজে কেঁদেছিলো অভি | তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলো |

আজ সকাল টা অনেক টা কালীপূজার ভাসানের পরের দিনের সকালের মতো | সব আছে তবু কিছুই নেই | চারিদিকে এক অদ্ভুত শূন্যতা | অনেক ভোরে ঘুম ভেঙেছিলো অভির | বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবার চেষ্টা করেছিলো কাল রাতের ম্যাচ টা কোনো দুঃস্বপ্ন নয়তো | কিন্তু না ওটা বাস্তব | কঠিন বাস্তব |দোকানে যেতে হবে,  মা কয়েকবার চিৎকার করে জানান দিয়েছে বেশ কয়েকবার |কিছুক্ষন পর টুথব্রাশ আর বাজারের থলে হাতে হাতে বেড়িয়ে পড়ে অভ|পাড়ার মোর টা ঘুরতেই দুপাশের রক থেকে উড়ে আসে কয়েকটা কথা ” টাকলু ফুটে গেলো ! ” ঘুরে তাকালো অভি | ” কিরে কচ্ছপ ! তোর গুরু তো একটা আস্ত মোষ রে… শালা কি জোর গুঁতিয়ে দিলো ” আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে ছেলেটার সামনে দাঁড়ালো অভি |”  কিরে কচ্ছপ তোর আবার কি হলো !” চোখে চোখ রেখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালো অভি সম্ভবত প্রথম বার |তার পর যা ঘটলো তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলো না | মাথা ঝুকিয়ে সজোরে ছেলেটার বুকে গুঁতো মারলো অভি |টাল সামলাতে না পেরে  মাটিতে লুটিয়ে পড়লো প্রতিপক্ষ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here