পন্ডিত অনিমেষ শাস্ত্রী

এই শুক্রবার অর্থাৎ একুশে ফেব্রুয়ারী মহা শিব রাত্রি উজ্জাপন হবে সারা বিশ্ব জুড়ে | অগণিত শিব ভক্তের সাথে আমিও অপেক্ষা করি এই দিনটার | শিব আমার খুব প্ৰিয়, খুব কাছের | সর্বপরি এই দেবতা টির সাথে আমরা সংসারী মানুষরা সবথেকে বেশি রিলেট করতে পারি নিজের সাথে |কারন তিনি সংসারী, স্ত্রী পুত্র নিয়ে তার গোছানো সংসার | সেই সংসারে ঝগড়া আছে, প্রেম আছে আবার বিরহ ও আছে |সব মিলিয়ে তিনি সম্পূর্ণ তিনি সুপ্রিম তিনি স্বর্ব শ্রেষ্ট | তাই তো তিনি দেবাদিদেব মহাদেব | তিনি সকল দেবতার আরাধ্যা দেব |

সর্বোচ্চ স্তরে শিব সর্বোৎকর্ষ, অপরিবর্তনশীল পরম ব্রহ্ম ।একদিকে যেমন  শিবের অনেকগুলি সদাশয় ও ভয়ঙ্কর মূর্তিও আছে। আবার তিনি  একজন সর্বজ্ঞ যোগী স্বর্ব ত্যাগী সন্যাসী । তিনি কৈলাস পর্বতে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করেন।আবার গৃহস্থ রূপে তিনি পার্বতীর স্বামী। তার দুই পুত্র বর্তমান। এঁরা হলেন গণেশ ও কার্তিক। ভয়ঙ্কর রূপে তাকে প্রায়শই দৈত্যবিনাশী বলে বর্ণনা করা হয়। শিবকে যোগ, ধ্যান ও শিল্পকলার দেবতাও মনে করা হয়। শাস্ত্র মতে শিবের পুজোর উপকরণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা সমৃদ্ধির সম্ভাবনা।শিবের আদি ও অন্ত নেই, তিনি অসীম, তিনি অনন্ত |

ব্যাপার টাকে একটু বেশি সরলিকরন করে ফেললাম? আচ্ছা বেশ এবার আসছি পুরানের কথায় |আমরা সবাই জানি শিবরাত্রি তে শিব লিঙ্গে জল ঢালা হয় কিন্তু  কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে শিব পুরাণে উল্লেখিত একটা গল্পের দিকে নজর ফেরাতে হবে।

শিব পূরাণ মতে এক সময় ভগবান বিষ্ণু এবং  ব্রহ্মার মধ্যে কোনো এক কারনে ভিষণ বিবাদ দেখা দিয়েছিল। লড়াই প্রায় বাঁধে বাঁধে। সেই সময় হঠাৎ করেই আগুনে জ্বলতে থাকা একটা কালো পিলার দুই দেবাতার মাঝে আর্বিভাব হয়। এই পিলার হঠাৎ করে এল কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্রহ্মা ঠিক করেন পিলারের উপরের দিকে গিয়ে দেখবেন কোথায় এর শেষ, আর বিষ্ণু দেব যাবেন নিচের দিকে।

সেই মতো দুজনে বেরিয়ে পরলেন ব্রহ্মা হংসের রূপ নিলেন ও বিষ্ণু বরাহ হলেন  |কিন্তু কোটি বছর কেটে যাওয়ার পরেও কেউই পিলার শুরু অথবা শেষ প্রান্ত খুঁজে উঠতে পারলেন না। অবশেষ বিষ্ণু দেব ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল এই কালো স্তম্ভ হল অনন্ত। অর্থাৎ এর না আছে শুরু, না শেষ। কিন্ত অন্যদিকে পিলার উপরের দিকে চলতে চলতে ব্রহ্মা দেখতে পেলেন একটা কেতকী ফুল পরে রয়েছে। কোটি বছরে চলে ক্লান্ত ব্রহ্মা দেব ঠিক করলেন কিছু সময় ওকটু জিরিয়ে নেবেন এবং এমন আজব স্থানে কেতকী এল কীভাবে তাও জেনে নেবেন। সেই মতো তিনি কেতকীকে প্রশ্ন করাতে জবাব এল, “আমি ভগবান শিবের মাথায় ছিলাম। এক সময় আমার মনে হল আমার থেকে শক্তিশালী আর কেউ না, কারণ আমার স্থান দেবাদিদেবর মাথায়।” আর ঠিক সে সময়ই শিব ঠাকুর মাথা দোলাতে কেতকি ফুল পরে গেলেন সর্বশক্তিমানের মাথা থেকে। সেই থেকেই এই স্থানে পরে রয়েছে কেতকী ফুল। ঘটনাটা শুনতে শুনতেই ব্রহ্মার মাথায় একটা প্ল্যান খেলে গেল। তিনি কেতকীকে বললেন ফুলটি যদি তাঁর সঙ্গে যায় এবং বিষ্ণুর কাছে গিয়ে বলে যে ব্রহ্মা এই পিলারের শেষ প্রান্ত খুঁজে পেয়েছেন, তাহলে ব্রহ্মা দেব স্বয়ং কেতকীকে আশীর্বাদ করবেন।

ব্রহ্মার কথা শুনে ফুলটি রাজি হয়ে গেলে এবং বিষ্ণুর কাছে গিয়ে বললো, কেতকী সাক্ষী ছিল যখন ব্রহ্মা পিলারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে ছিলেন। কিন্তু বিষ্ণু দেব নিজ অসফলতা মেনে নিলেন। আর ঠিক তখনই দেবাদিদেবের আর্বিভাব ঘটল। ব্রহ্মা এবং কেতকীকে মিথ্যা কথা বলতে দেখে দেবাদিদেব এতটাই রেগে গেলেন যে ভৈরব অবতারে এসে ব্রহ্মার পঞ্চম মাথা কেটেই ফেললেন। আর কেতকীকেও চরম শাস্তি দিলেন। আর সত্যের সাথে থাকার জন্য ভগবান বিষ্ণুকে দু হাত ভরে আশীর্বাদ করলেন দেবাবিদেব।

আসলে অগুনে জ্বলতে থাকা ওই কালো থামটি ছিস শিব লিঙ্গ। যার মধ্যে উপস্থিত রয়েছে এ জগতের অনন্ত শক্তি। আর এত মাত্রায় শক্তি যেখানে মজুত রয়েছে তাকে ঠান্ডা রাখতে না পারলে যে বিপদ! আর ঠিক এই কারণেই শিব লিঙ্গের মাথায় জল ঢালার প্রথা শুরু হয়। যেখানে অনন্ত শক্তি বিরাজমান সেই শক্তির উৎস স্থান কে ঠান্ডা রাখা, শান্ত রাখাই মূল উদেশ্য | তবে যারা বিশ্বাস করেন শিবের মাথায় জল ঢাললে শিবের মত জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী পাওয়া যাবে তাদের সাথে আমার কোনো বিরোধ নেই, আমি তাদের বিশ্বাসে আঘাত করতে  চাইনা |

আমি ব্যক্তিগত ভাবে অনুভব করেছি শিব লিঙ্গে জল, ফুল আর বেলপাতা অর্পণ করলে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শান্তি আসে মনে, এক ধরনের শক্তি এক ধরণের আত্মবিশ্বাস জন্মায় যার তুলনা হয়না আর কোনো কিছুর সাথে |এ নিশ্চই শিবের মহিমা|সব শিব রাত্রির মধ্যে ফাল্গুন  মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথির এই শিব রাত্রির তাৎপর্য সব থেকে বেশি কারন এটা আদি শিব লিঙ্গের আবির্ভাব তিথি ও একি সাথে শিব পার্বতীর বিবাহের দিন |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here