পন্ডিত অনিমেষ শাস্ত্রী

রং আমার খুব প্ৰিয়, ওই রং নিয়েই তো জীবনের এতো গুলো বসন্ত পার করে দিলাম, হ্যাঁ ওই কালার থেরাপির কথাই বলছি |পাথর হলো স্থায়ী রং, একেকটা গ্রহের একেকটা রং আর তত্ত্ব |সেই রং আর তত্ব মিলিয়ে রিমেডি |আর এই রঙের উৎসব দোল যে আমার একটু বেশি প্ৰিয় হবে সেটাই স্বাভাবিক |তবে দোল আমার কাছে নিছক একটা ছুটির দিন নয়, তার থেকে আরো একটু বেশি | আমাদের সনাতন ধর্মেও এই দিন টা অতি গুরুত্ব পূর্ন, অতি পবিত্র |

দোলযাত্রা মূলত একটি হিন্দু বৈষ্ণব উৎসব হিসেবে পালন হয় আমাদের এখানে । বহির্বঙ্গে বিশেষ করে উত্তর ভারতে পালিত হোলি উৎসবটির সঙ্গে দোলযাত্রা উৎসবটি সম্পর্কযুক্ত হলেও উজ্জাপন এর ক্ষেত্রে বা বাহ্যিক ভাবে অনেকটাই আলাদা।আবার এই উৎসবের ই অপর নাম বসন্তোৎসব যা বাঙালির খুব প্ৰিয় উৎসব গুলোর অন্যতম| ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।

আজ আর শুধু হিন্দু রা বা ভারতীয় রা নয় আরো অনেকে এই রঙের উৎসব পালন করে থাকে নিজের মত করে যেমন , শিখ, বৌদ্ধ,  জৈন |নেপাল, বাংলা দেশ শ্রীলংকা তেও মহা সমারোহে পালন হয় এই উৎসব|এমন কি ইউরোপ আমেরিকাতেও কোথাও কোথাও আজ হোলি খেলা হয় নিষ্ঠার সাথে |দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে দোল বা হোলি আজ আন্তর্জাতিক |দীপাবলী যেমন ফেস্টিভ্যাল অফ লাইট হোলি তেমন ফেস্টিভ্যাল অফ কালার |

বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সহিত রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি |

আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।বিশেষ শোভাযাত্রা ও নাম সংকীর্তন এ মেতে ওঠে গোটা বৈষ্ণব সমাজ |গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও ইস্কন এ এই দিন টি বিশেষ ভাবে পালিত হয় |

দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে যা জনপ্রিয়তা লাভ করে কবি গুরুর হাত ধরে । এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরসময়কাল থেকেই চলে আসছে। 

দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয়। এই বহ্ন্যুৎসব হোলিকা দহন বা মেড়াপোড়া নামে পরিচিত। এক সময় বাঙালি রাও দোলের আগের দিন এই উৎসব পালন করতো কোথাও কোথাও |আজ ফ্ল্যাট কালচার এর দাপটে এই উৎসব শহর তলি থেকে লুপ্ত প্রায় |

আমাদের পুরাণেও হোলি নিয়ে সুন্দর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে |স্কন্দ পুরান মতে ভক্ত প্রলহাদ অসুর বংশে জন্মগ্রহণ করলেও পরম ধার্মিক ছিলেন।পিতা হিরণ্য কোশিপুর নিজেকে বিষ্ণুর থেকেও বড়ো ভাবতেন |বিষ্ণু ভক্ত পুত্র কে হত্যা করতে চাইছিলেন, কিন্তু কিছুতেই প্রলহাদকে হত্যা করা যাচ্ছিল না। হিরণ্যকশিপুর বোন ‘হোলিকার’ বর প্রাপ্তি হয়েছিল যে হোলিকা আগুনে প্রবেশ করলেও তার কোনও ক্ষতি হবে না যদি না কোন অন্যায় কাজের জন্য আগুনে প্রবেশ করে। এবার হোলিকা ঠিক করলেন প্রলহাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করবেন এবং করলেনও। ফল হোল প্রলহাদ অক্ষত রইলেন কিন্তু হোলিকা পুড়ে ছাই হোল। প্রলহাদ অক্ষত ছিল কারন সয়ং বিষ্ণু ওই মুহূর্তে আগুনে প্রবেশ করেছিলেন। এর থেকেই হোলি কথার শুরু।

নামে যাই বলি, হোলি বা দোল কিংবা বসন্ত উৎসব, এই রঙের উৎসবের আবার নানা রং, কোথাও রঙিন স্মৃতিকে ঝালিয়ে নেওয়ার পালা, তো কোথাও নতুন রঙে কাউকে রাঙিয়ে নেওয়ার আবেগ। কোথাও বা জীবনের সব রঙের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নেওয়ার লড়াই আবার কেউ বা মশগুল বসন্তের রঙে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে। এভাবেই হোলির দিন সকাল থেকে বসন্তের সান্নিধ্যে দোল উৎসব উদযাপনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে আনন্দ নগরী তথা গোটা দেশ ।সঙ্গে আমিও |সবাইকে দোল যাত্রার শুভেচ্ছা, ভালো থাকুন, রঙীন থাকুন |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here