পন্ডিত অনিমেষ শাস্ত্রী

কদিন আগে জানিয়েছিলাম খুব শিগ্রই আসবো আপনাদের একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে, কথা মতো আজ তার প্রথম পর্ব নিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি|বিষয় টা হলো সৃষ্টির রহস্য এবং সৃষ্টির আদি পর্বে বা সৃষ্টি লগ্নে কার প্রথম আবির্ভাব, ঈশ্বর ধর্ম না মানুষ সেই সংক্রান্ত বিতর্ক|বিষয়টি একাধারে জটিল, রোমাঞ্চকর ও বিশাল তাই ঠিক করেছি কয়েকটা পর্বে তা নিয়ে আলোচনা করবো তুলে ধরবো আমার যৎসামান্য পড়াশোনা ও পর্যবেক্ষণ|আজ প্রথম পর্ব |

কে আগে এলো তা জানার আগে জানতে হবে কি আগে এলো আর কিভাবে এলো কেই প্রধান ভূমিকা পালন করলো এই সৃষ্টি নির্মানে|এবিষয়ে সনাতন ধর্ম শাস্ত্র যেমন বেদ পুরান ইত্যাদি গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা আছে যা মূলত সনাতন সৃষ্টি তত্ব বা Hindu cosmology নামে পরিচিত|এছাড়া বিজ্ঞান ও তার মতো করে ব্যাখ্যা করেছে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা ও অধ্যয়ন এর মাধ্যমে সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য, পরিবর্তিত হচ্ছে সৃষ্টি তত্ব সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা|আইনস্টাইন থেকে স্টিফেন হপকিন্স সবাই চেষ্টা করেছেন নিজের মতো করে কিছুটা হয়তো সফলও হয়েছেন|সম্প্রতি বিগ ব্যং থিওরির মাধ্যমে চেষ্টা হয়েছিলো সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটনের যা বেশ প্রশংসা পেয়েছিলো সর্বত্র|

প্রায় প্রতিটি বড়ো এবং প্রাচীন ধর্মগুলির নিজস্ব সৃষ্টি তত্ব আছে যেমন হিন্দু ধর্ম,ইসলাম ধর্ম এবং ক্রিস্টান ধর্ম নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে এই তত্ব |এদের মধ্যে একটি জিনিস কমন তা হলো এক অলৌকিক সর্ব শক্তিমান কে স্বীকার করে নেওয়া এবং এরা সবাই মেনে নিয়েছে যে আগে সর্ব শক্তি মান সৃষ্টিকর্তা তার পর তার সৃষ্টি এবং বাকি যা কিছু অর্থাৎ মানুষ জীব কুল ও মানুষের ধর্ম চেতনা তার পরে|

আমাদের সনাতন ধর্ম বিশ্বের প্রাচীরতম ধর্ম যা সৃষ্টি তত্ব কে আধ্যাত্মিকতার সাথে মিলিয়ে দেখে সংক্ষেপে বলতে হলে হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী ব্ৰহ্মাণ্ডকে বারে বারে সৃষ্টি তথা ধ্বংস করা হয়, প্ৰায় ৮৬৪ কোটি বছর পরপর। বেদ, পুরাণ ইত্যাদি বিভিন্ন ধৰ্মীয় গ্ৰন্থে উল্লেখিত যে ব্ৰহ্মাণ্ডের এই অস্তিত্ব কাল চার যুগে বিভক্ত- সত্য, ত্ৰেতা, দ্বাপর এবং কলি যুগ । বৰ্তমান যুগকে কলি যুগ বলে গণ্য করা হয়|এই যুগ শেষ হবে ভগবানের কল্কি অবতারের আগমন হলে তার পর হবে ধ্বংস এবং তারপর আবার নতুন করে সৃষ্টি|চক্রাকারে এই পদ্ধতি চলতে থাকবে|

এবার প্রশ্ন টা হচ্ছে কে আছে এই সৃষ্টি এবং ধ্বংসের পেছনে|আমাদের শাস্ত্র মতে আসল সৃষ্টি হয় পরম ব্রহ্ম বা আদি শক্তি থেকে আমরা সবাই সেই ব্রহ্মশক্তি বা আদি শক্তির অংশ তিনি আমাদের দেবতা ব্রম্হা কে তৈরী করেন ও তার উপর দায়িত্ব দেন প্রানীকুল তৈরী করতে ও বিশ্ব কে সাজিয়ে তুলতে এছাড়া পালন কর্তা হলেন বিষ্ণু এবং রক্ষা কর্তা মহাদেব|আবার ব্রম্হা সাত মানস পুত্র তৈরী করেন যার থেকে পৃথিবীতে মানব জাতির সৃষ্টি|

এছাড়াও শাস্ত্রে নানান রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যা সৃষ্টি তত্ব কে ব্যাখ্যা করে যদিও মুল বিষয় বস্তু একি থাকে অন্তর্নিহিত অর্থ অপরিবর্তিত থাকে, একটি তত্ব মতে হিন্দু পুরাণে একাধিক উপায়ে সৃষ্টিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের অন্যতম প্রাচীন সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী সৃষ্টির প্রকাশ হয়েছিল
হিরণ্যগর্ভ নামক এক মহাজাগতিক অণ্ডকোষ থেকে। পুরুষসূক্তের মতে, দেবতাদের দ্বারা পরাজিত পুরুষ নামক এক অলৌকিক মানবের ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে নানা বস্তুর সৃষ্টি। পুরাণ অনুসারে, বরাহরূপী বিষ্ণু কল্পের জল থেকে পৃথিবী বা ভূমিকে উদ্ধার করেছিলেন এগল্পও আমরা পড়েছি|আবার কিছু গল্পে দেখা যায়, ব্রহ্মাও বিষ্ণু থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। কল্পের সাগরে শেষনাগের অনন্তশয্যায় শায়িত বিষ্ণুর নাভি থেকে জাত পদ্মের ওপরে ব্রহ্মাকে বসে থাকতে দেখা যায়। সৃষ্টির আদিতে বিষ্ণুই একা ছিলেন, সৃষ্টির কথা স্মরণ হতেই তার নাভিজাত পদ্মে ব্রহ্মার উৎপত্তি হয়|অর্থাৎ বিষ্ণু স্বর্ব শক্তিমান ভগবান যার থেকেই সব কিছুর উৎপত্তি|

আবার বিজ্ঞান মনে করে অন্য ভাবে সৃষ্টির সূচনা হয়েছিলো, সেটাই স্বাভাবিক |পরবর্তীতে জনপ্রিয় বিগ ব্যাং থিওরি মতে একটা প্রচন্ড বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে অতি-ঘনত্ব সম্পন্ন, অতি-ক্ষুদ্র আকৃতির, এক অতি-উত্তপ্ত বস্তু বা অবস্থা থেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি। আর এই বিগ ব্যং এর পর থেকে এখন পর্যন্ত মহাবিশ্ব সদা সম্প্রসারিত হয়ে চলছে।অর্থাৎ সৃষ্টি একটা চলমান প্রক্রিয়া, থেমে নেই|আমরা আবার গড পার্টিক্যাল বা ঈশ্বর কণার কথাও শুনেছি |ঈশ্বর কণার আবিস্কার ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিতর্কের সাথে এক অর্থে প্রাসঙ্গিক।
তাও প্রশ্ন কিছু থেকেই যায়, কিসের বিস্ফোরণ হয়েছিলো, কিভাবে তা সংগঠিত হয়েছিলো|সকল প্রশ্নের উত্তর এখনো বিজ্ঞানের কাছেও অধরা|হয়তো আগামী দিনে সকল উত্তর আসবে তবে বলতেই হয় সৃষ্টি যখন হয়েছে তা সৃষ্টিকর্তার হাত ধরেই হয়েছে তার স্বরূপ যাই হোক না কেনো|

যে ভাবেই হোক, সৃষ্টি তো হলো এবং সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও জানলাম| তারপর কি? প্রান সৃষ্টি হলো কোথা থেকে মানুষের জগতের বিস্তার কিভাবে এলো আর কিভাবে এলো ধর্ম চেতনা, কোন পথে তৈরী হলো এতগুলি ধর্ম বিশ্বাস? মানুষ আগে না ধর্ম? অনেক প্রশ্ন বাকি রয়ে গেলো তাছাড়া এব্যাপারেও আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে বিজ্ঞান কি বলছে সেটাও জানা দরকার|এই সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে |পড়তে থাকুন, সঙ্গে থাকুন|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here