সৃষ্টিকর্তা আছেন, ঘুরবে রথের চাকা, সুপ্রিম কোর্ট নিমিত্ত মাত্র |জগতে ভালো মন্দ যা কিছু হয় তা জগতের নাথ অর্থাৎ জগন্নাথের নির্দেশেই হয়|তার ইচ্ছাতেই একদিন ঝড় থেমে পৃথিবী আবার শান্ত হবে|আমাদের শুধু বিশ্বাস রাখতে হবে প্রভু জগন্নাথের উপর আর প্রান ভরে ডাকতে হবে তাকে|তিঁনিই উদ্ধার করবেন জগৎকে সকল বিপদ থেকে|

এই পবিত্র রথ যাত্রা উৎসব শুধু বাংলা বা উড়িষ্যা নয় সারা দেশ এমনকি দেশের বাইরে গোটা বিশ্বে আজ পালিত হয় |সনাতন ধর্মের এ এক বিশেষ উৎসব|মূলত জগন্নাথ দেব কে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয় এই প্রাচীন উৎসব|এই জগন্নাথ আসলে বিষ্ণুর একটি বিশেষ রূপ, তিনি জগতের নাথ|তিনিই বিশ্বর অধিপতি|আজ এই বিশেষ সময়ে আসুন জেনে নিই তার মহিমা, তার স্বরূপ ও তার রথ যাত্রার ব্যাখ্যা সহ তাৎপর্য|

শাস্ত্রে দুটি তত্ব আছে জগন্নাথ দেবের আবির্ভাব সম্পর্কে প্রথম তত্ব বলে সবর রাজার হাত থেকে বিদ্যাপতির চেষ্টায় নীল মাধব আবিষ্কার ও অদৃশ্য হওয়ার পর , কৃষ্ণ তার ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের সম্মুখে আবিভূর্ত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তার মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন। মূর্তিনির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকেন। তখন এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী সেজে স্বয়ং বিশ্বকর্মা তার সম্মুখে উপস্থিত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে জানিয়ে দেন মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তার কাজে বাধা না দেন। তাই হয়|বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। রাজা ও রানি সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রতিদিন তারা বন্ধ দরজার কাছে যেতেন এবং শুনতে পেতেন ভিতর থেকে খোদাইয়ের আওয়াজ ভেসে আসছে।

এই ভাবেই চলতে থাকে কাজ কিন্তু ৬-৭ দিন
বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। অত্যুৎসাহী রানি কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন। দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত। এই রহস্যময় কাষ্ঠশিল্পী ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। মূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন দেবর্ষি নারদ তার সম্মুখে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ|এই রূপেই তিনি পূজা নিতে চান|তারপর তার সেই বিগ্রহ স্থাপিত হয় পুরীর মন্দিরে|

দ্বিতীয় এবং কিছুটা কম জনপ্রিয় আরেকটি তত্ব অনুসারে বৃন্দাবনে গোপীরা একদিন কৃষ্ণের লীলা ও তাদের কৃষ্ণপ্রীতির কথা আলোচনা করছিলেন। কৃষ্ণ গোপনে সেই সকল কথা আড়ি পেতে শুনছিলেন। কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রাকে নিয়োগ করা হয়েছিল গোপীরা যখন কৃষ্ণের কথা আলোচনা করেন তখন কৃষ্ণ যেন তাদের নিকটবর্তী না হতে পারে সেদিকে নজর রাখার জন্য। কিন্তু গোপীদের কৃষ্ণপ্রীতি দেখে পরিতুষ্ট সুভদ্রা তাদেরই কথা শুনতে শুনতে বিমোহিত হয়ে গেলেন। দেখতে পেলেন না যে তাদের দুই দাদা কৃষ্ণ ও বলরাম এগিয়ে আসছেন। শুনতে শুনতে দুই ভাইয়ের কেশ খাড়া হয়ে উঠল, হাত গুটিয়ে এল, চোখদুটি বড় বড় হয়ে গেল এবং মুখে আনন্দের উচ্চ হাসির রেখা ফুটে উঠল।এই বিশেষ রূপটি জগন্নাথ হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন তার ভক্ত দের দ্বারা|

অনেকে মনে করেন বহুদিন কৃষ্ণ বিরহে কাটানোর পর কৃষ্ণের বৃন্দাবনে আসা কে স্মরণ করেই মর্তে রথ যাত্রার সূচনা হয়|

তিন দেবতাকে সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরেই পূজা করা হয়। তবে প্রতি বছর আষাঢ় মাসে তাদের রাজপথে বের করে রথারূহ করে তিন কিলোমিটার দূরে গুন্ডিচা মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়|জগন্নাথ সুভদ্রা ও বলরাম তিনটি পৃথক রথে আরোহন করেন|জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ|প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত সমাগম হয় পুরীর রথ যাত্রা উপলক্ষে|আজও প্রথা মেনে পুরীর রাজা সোনার ঝাড়ু দিয়ে রাস্তা ঝাঁট দিয়ে রথ যাত্রার সূচনা করেন|

জগন্নাথের ভক্তদের বিশ্বাস, স্নানযাত্রার দিন যদি জগন্নাথদেবকে দর্শন করা যায় তাহলে সকল পাপ থেকে মুক্তি মেলা সম্ভব। এই জন্য অসংখ্য ভক্ত স্নানযাত্রা উপলক্ষ্যে পুরীর মন্দির দর্শনে যান।স্নান যাত্রার পর জ্বরও আসে এবং রাজবৈদ্যর ওষুধ গ্রহনের পর সুস্থ হন জগন্নাথ ও তারপর ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রার সাথে রথে আরোহন করে মাসির বাড়ি যান এবং এক সপ্তাহ সেখানে কাটিয়ে আবার নিদিষ্ট সময়ে নিজ ধামে ফিরে আসেন|এই গমন কে সোজা রথ ও প্রত্যাবর্তন কে উল্টো রথ বলে|জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথী তে স্নান যাত্রা ও অসাড় মাসের শুক্লা পক্ষের দ্বিতীয়া তিথীতে হয় রথ যাত্রা|

মহাপ্রভুর সময়ে পুরীর বাইরে বাংলায় জনপ্রিয় হয় রথ যাত্রা, সব ভেদাভেদ ভুলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষে যোগ দিতে শুরু করেন রথ যাত্রায়|মাহেশের রথ যাত্রা আজও ব্যাপক জনপ্রিয়|শ্রীল প্রভুপাদ ইস্কন প্রতিষ্ঠা করার পর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর অন্যান্য স্থানেও রথযাত্রা পালন করতে শুরু করেন যে পরম্পরা আজও চলছে|
এ বছর করোনার কারনে রথ যাত্রা কে ঘিরে সেই জনসমাগম না হলেও নিয়ম নিষ্ঠা ও ভক্তির অভাব ঘটেনি এতটুকু|প্রভুর কাছে সবার হয়তো একটাই প্রার্থনা,মিটে যাক সমস্যা, রক্ষা পাক পৃথিবী|সবাই কে রথ যাত্রার শুভেচ্ছা|জয় জগন্নাথ|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here